নতুন অর্কিড পেল বাংলাদেশ

0
43

বাংলাদেশের বনবাদাড়ে প্রায় ১৭৮ প্রজাতির অর্কিড জন্মে (সূত্র: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ, খণ্ড-১২)। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্কিডের তালিকায় যুক্ত হলো নতুন একটি প্রজাতি। রাজশাহী এলাকার একটি প্রাকৃতিক ঘাসবনে এই প্রজাতির অর্কিডের ফুলের দেখা পাওয়া যায় ২০০৮ সালে। কিন্তু প্রজাতিটি কোনো উদ্ভিদ গবেষকের দৃষ্টিগোচর না হওয়ার কারণে শনাক্ত হয়নি। ২০১৪ সালের জুন মাসে সেই অর্কিডের খোঁজে রাজশাহী গিয়ে প্রায় ২০ প্রজাতির উদ্ভিদে অর্কিডের ফুল দেখতে পাই। ফুলের নমুনা সংগ্রহ করি, ছবি তুলি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল হাসান ও অধ্যাপক জসীম উদ্দিনকে দেখাই এবং নমুনা দুটি উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের হার্বেরিয়ামে ও বাংলাদেশ জাতীয় হার্বেরিয়ামে জমা দিই।

পরে ভারতের বিখ্যাত অর্কিড গবেষক পঙ্কজ কুমারের কাছে ছবি পাঠাই এবং কথা বলি। তিনি জানান, এটি ইউলোফিয়া গণের নতুন কোনো প্রজাতি । তিনি এর পাতার ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে বলেন। ২০১৫ সালে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসয়ান এবং আণবিক জীববিজ্ঞান বিভাগে গিয়ে জানতে পারি যে ডিএনএ পরীক্ষা করা যাবে না। ইতিমধ্যে লন্ডনের বিখ্যাত কিউ বোটানিক গার্ডেনের অর্কিড বিশেষজ্ঞ এন্ড্রু হুয়েটিম্যানের (André Schuiteman) সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং নমুনা পাঠাই। দুই মাস পর তিনি অজানা এই অর্কিড শনাক্ত করেন ইউলোফিয়া অবটিউজা (Eulophia obtusa) হিসেবে। বাংলাদেশে নতুন এই প্রজাতি নিয়ে রোনাল্ড হালদার, পঙ্কজ কুমার, এন্ড্রু হুয়েটিম্যান এবং এই লেখকের একটি যৌথ গবেষণাপত্র সম্প্রতি সিপ্রঙ্গারজার্নালের অন্তর্ভুক্ত কিউ বুলেটিনের জুন ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। কিউ হার্বেরিয়ামে ১৯০২ সালে ভারত থেকে সংগৃহীত নমুনা, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ এবং একটি আঁকা ছবি প্রজাতিটি শনাক্ত করতে বিশেষ অবদান রাখে। গত ১০০ বছরে প্রাকৃতিক আবাসে প্রজাতিটি দেখা যায়নি। এ কারণে প্রজাতিটিকে অতি দুর্লভ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

অর্কিডের এই প্রজাতি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানা ছিল না। ১৮৩৩ সালে ভারতের উত্তরাখন্ড থেকে প্রথম এটির বিষয়ে জানা যায়। ১৯০২ সালে গঙ্গার অববাহিকায় এটি পাওয়া গিয়েছিল। দক্ষিণ ভারতে আঠারো শতকের দিকে পাওয়া গিয়েছিল এমন তথ্য আছে। বাংলাদেশে এটির উপস্থিতির কোনো তথ্য ও প্রকাশনাও নেই। ২০১৩ সালে আসামের চিরাং রিজার্ভ ফরেস্ট এবং নেপাল থেকে পাওয়া গেছে বলে তথ্য রয়েছে, তবে এটির কোনো নমুনা ও ছবি গবেষকেরা দেখাতে সক্ষম হননি। গত ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই দুর্লভ এই প্রজাতির নমুনা ও ছবি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেল।

প্রকাশনাপত্রটিতে বাংলাদেশে নতুন আবিষ্কৃত প্রজাতিটিকে আইইউসিএনের প্রজাতির হারিয়ে যাওয়া ঝুঁকির তালিকা (রেডলিস্ট) নির্ণয়ের নিয়ম অনুসারে মহাবিপন্ন উদ্ভিদ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে যেখানে এই উদ্ভিদ জন্মে, সেই জমিটি অনেক কাল ধরেই ঘেসোজমি ছিল। বর্ষা এলেই ঘাসের সঙ্গে অর্কিড চারা গজিয়ে বড় হতো এবং ফুল ফুটত। গ্রামের মানুষের কাছে হয়তো এটি ঘাসফুল নামেই পরিচিত ছিল। ২০১৫ সালে স্থানীয় এক কৃষক মালিকের কাছ থেকে জমিটুকু ঠিকা নিয়ে সবজি চাষের পরিকল্পনা করেন। সেই বছর লাঙল দিয়ে জমি চাষের ফলে ৭ থেকে ১০ কেজি কন্দ বা বিছন ধ্বংস হয়ে যায়। সে বছর জমি চাষ করার পরও সবজি চারার মধ্যেও ৩১০টি চারা গজিয়েছিল বেঁচে যাওয়া বিছন থেকে; কিন্তু ফুল ধরেনি। দুটি চারা সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে আসি এবং টবে লাগাই।

বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ৮ হেক্টর যায়গার মধ্যে এটি জন্মে এবং তিন দিকেই কৃষিজমি ও চাষাবাদ। ২০১৫ সাল থেকে ধ্বংস করা ঘাসবনটি আগের রূপে ফিরিয়ে আনার জন্য স্থানীয় কৃষকের মাধ্যমে কাজ শুরু করি এবং ফসল চাষ বন্ধ করা হয়। তবে কন্দ (বিছন) চারা গজানোর হার কমে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রাকৃতিক আবাসে মাত্র ছয়-সাতটি চারা গজিয়েছে।

২০১৬ সালে টবে থাকা কন্দ থেকে কয়েকটি চারা গজায়, যার দুটি মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ সংগ্রহশালার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে এবং নির্বাচিত জায়গায় রোপণ করি। চারা দুটি সে বছর বড় হয়। ২০১৭ সালে চারা গজিয়েছে কি না, জানার জন্য কথা বললে সেখানকার সেই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কোনো তথ্য দিতে পারেননি! আমার বাসার টবে এ বছরও দুটি চারা গজিয়েছে।

দুর্লভ এই অনিন্দ্যসুন্দর ফুলের অর্কিড প্রজাতিটি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে! প্রজাতিটি সংরক্ষণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উদ্যোগী হবেন বলে আশা করছি।

LEAVE A REPLY