দু’দিনে সাতশ’র বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দাবি

0
25

‘নিথর দেহ পড়ে আছে বাড়ির উঠানে, ধানক্ষেতে। কারো লাশ পড়ে আছে বাড়ির পাশের খাল কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে। শতশত মৃতদেহ পড়ে আছে রাস্তায়। বাড়ি পুড়ে ছাই হয়েছে। কেউ কেউ জঙ্গলে যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। সীমান্তে কড়াকড়ি থাকায় এপারেও আসা যাচ্ছেনা। যারা বেঁচে আছে তারা নিহতদের লাশ দাফন করছে। কিন্তু ভাগ্যে জুটছেনা কাফনের কাপড়।’

গত দুইদিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে এই চিত্র বিরাজ করছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা। তাদের দাবি, রাখাইন প্রদেশে দুইদিনে সাত শতাধিক রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে সেদেশের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি। গত শুক্রবার রাতে সেখানকার বেশকিছু পুলিশ ফাঁড়িতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার পর থেকে রবিবারপর্যন্ত মংডুর উত্তরাঞ্চলের গ্রাম রাথিডং, হাতিপা, খোয়ারিপাড়াসহ বেশকিছু গ্রামে এই হত্যাযজ্ঞ চালায় সেনাবাহিনী ও বিজিপি।

লন্ডনভিত্তিক আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি কো কো লিন ইত্তেফাককে বলেন, আরসার হামলার সাথে সাধারণ রোহিঙ্গাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা একদম অসহায়। আরসার হামলার প্রতিশোধ নিতে মিয়ানমার সৈন্যরা নিরীহ রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা চালাচ্ছে। দুইদিনে সাত’শ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। এখনো থামেনি হত্যাযজ্ঞ। শনি ও রবিবারও বাংলাদেশ অংশে অপেক্ষা করা রোহিঙ্গাদের উপরও গুলি চালিয়েছে বিজিপি।

বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বাস্তবে গত দুইদিনে উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে দুই হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গতকাল রবিবার দিনভর উখিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ও কুতুপালং বস্তি পরিদর্শন করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। আবার কয়েকশ রোহিঙ্গা বস্তি পর্যন্ত পৌঁছাতে না পেরে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে তাঁবু টাঙিয়ে অথবা খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করছে। আবার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অংশেও অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষা করছে।

কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তির পরিচালনা কমিটির একজন নেতা ইত্তেফাককে বলেন, অনুপ্রবেশের বিষয়টি যেহেতু বৈধ নয় সেহেতু এটা প্রকাশ্যে বলা যাচ্ছেনা। তবে রোহিঙ্গারা যে দলে দলে ঢুকছে সেটা সবাই দেখছে। গত রাতে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ঢুকেছে এই বস্তিতে। তার আগের দিন ঢুকেছে অন্তত ৭-৮’শ। টেকনাফ সীমান্তে কড়াকড়ি বেশি থাকায় সবাই এদিকে ঝুঁকছে।

মিয়ানমারে গত শুক্রবার থেকে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর থেকে রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের শতশত ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিও এবারের নির্যাতনের ঘটনা কিনা তা নিরপেক্ষ সূত্র থেকে যাচাই করা কঠিন। তবে এগুলোর সঙ্গে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কথার মিল পাওয়া যায়। তেমনই একজন রিজিয়া। তিনি ঘুমধুম এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন। এই নারী ইত্তেফাককে জানান, তার স্বামীকে মিয়ানমারের সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেছে। বাড়ির পেছন দিয়ে তিনি কোনোমতে শিশু সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে আসেন। একথা বলতে বলতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কড়া নজরদারির মাঝেও সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ চলছে। তবে বিজিবির বাঁধার মুখে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এখনো অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন। শনিবার থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির জলপাইতলী, পশ্চিমকূল ও বাইশারী সীমান্তে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ এবং শিশু অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে সেখানকার জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের হাতে গুলিবিদ্ধ ৪ রোহিঙ্গা চট্টগ্রাম মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল রবিবার সকালে তাদের স্বজনরা আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করে। গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা হচ্ছেন- আকিয়াবের মংডু থানার দেবিন্না এলাকার নুরুজ্জামানের পুত্র জিয়াবুল, নাচিদং এলাকার হামিদ হোসেনের পুত্র মো. ইলিয়াছ, সাহেব বাজার এলাকার হোসেন আহমদের পুত্র মো. তোহা ও সাহেব বাজার এলাকার নবী  হোসেনের পুত্র মোবারক হোসেন।

ইত্তেফাক

LEAVE A REPLY