সংঘাত জড়িয়ে পড়েছেন ধোনি, অধিনায়ক হতে চলেছেন কোহলি

0
170

স্পোর্টস ডেস্ক অনিল কুম্বলের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তিনি কী বলেছিলেন জানি না। কিন্তু রবি শাস্ত্রী টিম ডিরেক্টর হয়ে আসার পর তাঁর কাছে প্রথমেই একটা প্রতিশ্রুতি চান রবিচন্দ্রন অশ্বিন।

‘রবি ভাই দিন বা রাতের যে কোনও সময় আমার ক্রিকেট আলোচনা করার ইচ্ছে করতে পারে। আপনার দরজা কি খোলা পাব?’ শাস্ত্রী বলেন নিশ্চয়ই। তিনি টিম ডিরেক্টর থাকাকালীন সাড়ে সতেরো মাসের মধ্যে একাধিক বার অশ্বিন সেই ঘরে অফুরান নানা বক্তব্য সমেত হানা দিয়েছেন। যথেষ্ট সৌজন্যও পেয়েছেন।

কিন্তু একটা জিনিস পাননি— নিরাপত্তা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পাঁচ ম্যাচে অ্যান্টিগার নায়ককে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি বল করিয়েছিলেন মাত্র ১৫ ওভার। মানে কোটা থেকে পাঁচ ওভার কম। ইডেনে পাকিস্তানের সঙ্গে টার্নারে তিনি উইকেট পাওয়ার পরেও অত্যাশ্চর্য ভাবে দ্বিতীয় ওভারে আক্রমণ থেকে তুলে নেন। এ বারের আইপিএলে আরও খারাপ। ১৪ ম্যাচে অশ্বিনকে বল করান মাত্র ৪৪ ওভার। কোটার চেয়ে যা বারো ওভার কম।

শোনা যায় এককালে ধোনির ভীষণ প্রিয় পাত্র ছিলেন অশ্বিন। হরভজনকে সেই সময় বসিয়ে রেখে তিনি টানা অশ্বিনে আস্থা রেখেছেন। ক্রিকেটমহলের নোংরা গসিপ অনুযায়ী একটা সময়ে তাদের মতবিরোধ দেখা দেয়। মাঠের বাইরের কোনও ইস্যু নিয়ে। এরপর ইংল্যান্ড সফরে অশ্বিনকে বাদ দিয়ে ধোনি জাডেজাকে খেলানো শুরু করেন। অশ্বিন লড়াই করে আবার দলে ফেরেন।

ফের অশ্বিন অব্যবহৃত থাকার প্যাটার্ন শুরু হয়ে যায় ঢাকার এশিয়া কাপ থেকে। তা বাড়তে বাড়তে ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পৌঁছে যায় আইপিএলে। আইপিএলের অন্যতম প্রিয় গসিপ ছিল যে একটা সময়ে নাকি পুণের মালিককে হস্তক্ষেপ করে অশ্বিনের পুরো কোটা পূর্ণ করানোর জন্য অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছিল।

অশ্বিনের ঘনিষ্ঠমহলের আলোচনা বিশ্বাস করলে এই সময়ে সংশ্লিষ্ট বোলার আশা করেছিলেন যে টিম ডিরেক্টর তার কলমে কোথাও না কোথাও একে সমালোচনা করে তার পাশে থাকবেন।

যে কোনও কারণেই হোক আনন্দবাজার সহ দেশের কিছু কাগজে নিজের সিন্ডিকেটেড কলমে  ধোনির বিরুদ্ধে যাননি শাস্ত্রী। ব্যক্তিগত ভাবে অশ্বিনের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন হয়েও প্রকাশ্যে ভারত অধিনায়কের বিরুদ্ধাচারণ করেননি।

অনিল কুম্বলেকে যখন সৌরভ-শচিনরা হেড কোচ বাছেন তখন প্রথম কথাই বলা হয়েছিল, বিদেশে অশ্বিনের কথা ভেবে আরও বেশি করে ওকে করা হল। এক সদস্য বলেছিলেন, ‘ম্যাচ জেতায় অশ্বিন। কিন্তু বিদেশে ওর রেকর্ড ভাল নয়। সেটা ভাল করতে হলে কুম্বলের সাহায্য খুব কাজে আসবে।’

রোববার রাতে টিভিতে বারবার দেখা যাচ্ছিল সাইডলাইনের ধারে কুম্বলে কখনও কথা বলছেন তার অধিনায়কের সঙ্গে। কখনও অশ্বিনের সঙ্গে। বিসিসিআই টিভিতে এ দিনের সাক্ষাৎকারে অশ্বিন স্বীকারই করেছেন দ্বিতীয় ইনিংসে ৮৩ রানে ৭ উইকেটে একটা মস্ত ভূমিকা নিয়েছেন হেড কোচ।

প্রথম ইনিংসে উইকেট শূন্য থাকার পর দ্বিতীয় ইনিংসের আগে কুম্বলে তাকে বোঝান এই মন্থর অ্যান্টিগা পিচে বলের গতির কী রকম হেরফের করতে হবে। আর বডিটা প্রথম ইনিংসের তুলনায় আরও বেশি করে ডেলিভারিতে দিতে হবে।

ভিভের মাঠে তার চোখের সামনে চার দিনে টেস্ট শেষ করে দেওয়া বিদেশে ভারতীয় ক্রিকেটের সর্বকালীন সেরা বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে অবশ্যই একটা। তা ওয়েস্ট ইন্ডিজের মান যেখানে নামুক। এটা হেড কোচেরও জ্বলজ্বলে সাফল্য সন্দেহ নেই। কিন্তু তারও আগে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয় কামব্যাক। যা শুরু হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় বিরাট রাজের জমানার দ্বিতীয় টেস্ট দিয়ে।

ম্যান অব দ্য ম্যাচ অশ্বিনকে স্বাগত জানিয়ে তার ভক্তরা বলেছেন, সিংগম সিঙ্গলাধেন ভারুম। রজনীকন্তের জনপ্রিয় ছবির ডায়লগ। যার কাছাকাছি বাংলা: আমি যা বলেছি তাই করে দেখাবো। আমি যা বলিনি সেটাও করে দেব।

ভারত অধিনায়কের ডাবল সেঞ্চুরি এবং মাইক্রোস্কোপের তলায় থাকা অশ্বিনের ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়া, সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিনে ভারতীয় ক্রিকেটমহলের অবিরাম আলোচনার বিষয় ছিল। সেই আড্ডার মূল সুর, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্যাপ্টেন জেসন হোল্ডারের ওপর যত না চাপ হল, তার চেয়ে ঘূর্ণাবর্ত হাজির হল ধোনির ভাগ্যাকাশে।

বিরাট কোহলি এই নিয়ে গত সাত টেস্টের ছ’টা জিতলেন। ভারত অধিনায়ক হিসেবে অসামান্য টেস্ট রেকর্ড! ব্যাটসম্যান হিসেবে যত তিনি উন্নত হচ্ছেন ততই শচীনের সঙ্গে তুলনা বাড়ছে। কিন্তু সেটা নিছকই অ্যাকাডেমিক। সেখানে কোনও পদ হারানো জেতার ব্যাপার নেই।

নেতৃত্বের ব্যাপারটা অন্য। এটা সরাসরি অধিনায়কত্বের স্টক এক্সচেঞ্জ নিয়ে ডুয়েল। হয় আমি জিতব নয় ধোনি। আর সেই লড়াইতে অধুনা পাল্লা ভারী কোহলির দিকে।

মিসবাহর টিমের মতো সিরিজে এগিয়ে গিয়ে আবার ভারত অপ্রস্তুত হয়ে পড়লে অন্য কথা। কিন্তু জামাইকাতেও যদি কোহলি-উজান বইতে থাকে, ভারতীয় ক্রিকেটজনতা নতুন দাবি তুলবেই।

তারা বলবে তিনটে ফর্ম্যাটের মাথাতেই এ বার কোহলিকে বসাও। ভারত ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড সিরিজ খেলছে সেপ্টেম্বরে। ওয়ান ডে শুরু অক্টোবরের মাঝামাঝি। অক্টোবরেই তাই জানা যাবে অধিনায়ক-ধোনি বিদায় ঘটছে কি না?

যদি না আপাতত ওয়েস্ট ইন্ডিজে থাকা সন্দীপ পাটিলদের কমিটি সেপ্টেম্বরেই নতুন ক্যাপ্টেনের সীমিত ওভারেও অভিষেক ঘটিয়ে দেয়। কাছাকাছি সময়ে আরও একটা নির্বাচনের সামনে পড়বেন ধোনি। যখন অক্টোবর নাগাদ পুণে সুপারজায়ান্টস ম্যানেজমেন্টকে বেছে নিতে হবে ধোনিকে তারা অধিনায়ক রাখবে? নাকি স্টিভ স্মিথ বা অশ্বিন কাউকে বেছে নেবে? সেই নির্বাচনটা হয়তো ভারতের আগেই হয়ে যেতে পারে।

সুপারজায়ান্টস অধিনায়ক হিসেবে শেষ ম্যাচ শেষ বলে ছক্কা মেরে জিতিয়ে শেষ করলেও ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তাদের কাছে মোটেই মধুর স্মৃতি রেখে যাননি ধোনি। অশ্বিনকে কম ওভার বল করানো থেকে শুরু করে অ্যাডাম জাম্পাকে খেলাতে না চাওয়া। নিজে ব্যাটিং অর্ডারে পরে যাওয়া। নানান অসন্তুষ্টি তার বিরুদ্ধে সেই সময় দানা বেধেছে।

আইপিএলে মালিকপক্ষ বনাম জাঁদরেল অধিনায়ক— এই সব খুচখাচ সংঘাত হয়েই থাকে। সব টিমে কমবেশি হয়। কিন্তু পুণের চূড়ান্ত খারাপ পারফরম্যান্স অধিনায়ক ধোনিকে সেই ডেঞ্জার জোনেই রেখে দেয়। তার অবস্থার উন্নতি না ঘটিয়ে। কী হবে যদি ভারতীয় নির্বাচকেরা তার ভাগ্য স্থির করার আগেই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি তাকে সরিয়ে দেয়?

ক’দিন আগে যোগাযোগ করা হলে পুণের পক্ষে সঞ্জীব গোয়েন্কা অবশ্য বললেন, ‘এই সব নিয়ে একদমই ভাবিনি। নতুন মরসুম অনেক দূরে।’

তিনি নীরব থাকলেও অ্যান্টিগার বাইশ গজের ভাষা ১৩,৬২৯ কিলোমিটার বিমান দূরত্বের মুম্বাই ক্রিকেটমহলে আরও সরব সংলাপ নিয়ে পৌঁছেছে।

তা রজনীকন্তের সংলাপ না হোক। তাৎপর্যপূর্ণ ক্রিকেটীয় ভাষা তো বটেই। বিরাট তৈরি হয়ে গিয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। অধিনায়কত্ব আদৌ ওর খেলায় প্রভাব ঘটাচ্ছে না। বরঞ্চ অধিনায়ক হিসেবে হাজার রান বা তার বেশি করেছে এমন ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেনদের তালিকায় বিরাটের অ্যাভারেজ সবচেয়ে ভাল। ১১ টেস্টে ৬০.৮৯। তা ছাড়া আজকের এই ধোনিকে তো বোঝাই গেল!

যোগ্যতা থেকেও এ ইচ্ছাকৃত অশ্বিনের রাস্তায় দাঁড়াচ্ছিল। তা হলে তো এর যাওয়াই উচিত।

(জনবার্তা/মেহেদী হাসান)

প্রতি মুহুর্তের খবর পেতে www.jonobarta.com

LEAVE A REPLY