ডেঙ্গুতে মৃত্যু শতক ছুঁই, আক্রান্ত ৩২ হাজার পেরোল

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১২৫ জনের। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সেপ্টেম্বরে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল রোগীতে উপচে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন ও জনসচেতনতার অভাবকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা এখন জরুরি।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু শতক ছুঁই, আক্রান্ত ৩২ হাজার পেরোল
Bangladesh Dengue: Patients suffering from dengue receive treatment at Mugda Medical College and Hospital in Dhaka, Bangladesh.(AP)

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ হাজার ৫০১ জনে পৌঁছেছে এবং মোট মৃত্যু হয়েছে ১২৫ জনের। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে নতুন ৪৩৭ জন রোগী এবং মারা গেছেন আরও ৩ জন। এ সংখ্যা গত বছরের তুলনায় শঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০২৪ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল এক লাখ এক হাজারের বেশি মানুষ এবং মারা গিয়েছিল ৫৭৫ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায় তবে গত বছরের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে আগস্ট মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। আগস্টে অন্তত ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন এবং আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার। এর আগে জুলাই মাসে ছিল সর্বোচ্চ মৃত্যু সংখ্যা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে এবং এ বছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বসার বলেন, “পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। ভাইরাস ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। নির্ভরযোগ্য হস্তক্ষেপ না হলে হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। আমার আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরে মামলার সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে যেতে পারে।”

রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ইতোমধ্যেই সীমা ছাড়িয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল—সবখানেই প্রতিদিন নতুন রোগীর ভিড় বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা বেড না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা ওষুধ নেই। রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল পানীয় গ্রহণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণেই সেরে ওঠা সম্ভব। তবে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রক্তক্ষরণজনিত ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম প্রাণঘাতী হতে পারে।

ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়নকে দায়ী করছেন। দীর্ঘ বর্ষা ও অস্বাভাবিক গরম আবহাওয়া এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। ঢাকা শহরের অলি-গলিতে জমে থাকা পানি, বাড়ির ছাদে রাখা টব ও ব্যবহারহীন টায়ারে জমা বৃষ্টির পানি, এমনকি ফ্রিজের ট্রেতেও মশা ডিম দিচ্ছে। নগরবাসীর অসচেতনতা এবং সিটি করপোরেশনের সীমিত পদক্ষেপ সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। অনেক নাগরিক অভিযোগ করছেন, ফগিংয়ের কাজ নিয়মিত হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না এবং ব্যবহার করা ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়বে এবং বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি। দেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব, দুর্বল অবকাঠামো ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। ড. কবিরুল বসার বলেন, “আমাদের দরকার সমন্বিত ফগিং কার্যক্রম, জনগণের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং উৎস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ। সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সক্রিয় হতে হবে।”

সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে, জমে থাকা পানি সপ্তাহে অন্তত একবার ফেলে দিতে, পানির ট্যাংক ও ড্রাম ঢেকে রাখতে, টবে পানি জমতে না দেওয়া এবং শোবার সময় মশারি ব্যবহার করতে। পাশাপাশি জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও ক্ষোভও বাড়ছে। আক্রান্ত রোগীদের খবর প্রতিদিন শেয়ার হচ্ছে। পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জোর দিচ্ছেন। স্কুল, কলেজ ও অফিস পর্যায়ে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর হতে পারে।

বর্তমান তথ্য-উপাত্তে স্পষ্ট যে বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক পথে এগোচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যেই ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু অতিক্রম করেছে শতকের সীমা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা সত্যি হলে সেপ্টেম্বরে রোগীর চাপ দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যেতে পারে, যা হাসপাতালের সক্ষমতাকে ভেঙে ফেলবে। সুতরাং এখনই যদি সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন এবং নাগরিক সমাজ সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে না।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0