বাংলাদেশের ASEAN-এ যোগদানের প্রচেষ্টা

বাংলাদেশের আসিয়ান (ASEAN)-এ যোগদানের প্রচেষ্টা নতুন গতি পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস বিভিন্ন দেশ ও ফোরামে সক্রিয়ভাবে সমর্থন চাইছেন। মালয়েশিয়ার দৃশ্যমান সমর্থন ইতিবাচক দিক হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা ইস্যু ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সদস্যপদ অর্জনের পথে বড় বাধা। অর্থনৈতিক দিক থেকে আসিয়ান বাজারে প্রবেশ করলে বাংলাদেশের রপ্তানি ও আঞ্চলিক সংযোগে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

বাংলাদেশের ASEAN-এ যোগদানের প্রচেষ্টা
ASEAN

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান (ASEAN)-এ যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছে। তবে ২০২৪–২৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস আসিয়ানকে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং দেশকে প্রথমে “Sectoral Dialogue Partner (SDP)” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি পূর্ণ সদস্য হওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

২০২৪ সালের আগস্টে মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে ইউনুস আসিয়ান চেয়ারম্যানশিপের অধীনে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চান। পরে ২০২৫ সালের এপ্রিলে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত BIMSTEC শীর্ষ সম্মেলনের সুযোগে তিনি থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। একই বছর জাপানে অনুষ্ঠিত “Future of Asia” ফোরামে তিনি সাবেক মালয়েশিয়ান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সমর্থনও প্রত্যাশা করেন। জুলাই মাসে তিনি আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামে যোগ দেন এবং বাংলাদেশের অবস্থান আবারও স্পষ্ট করে তোলেন।

এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই মালয়েশিয়ার দৃশ্যমান সমর্থন পেয়েছে। মালয়েশিয়ার ডেপুটি মন্ত্রী লিউ চিন টং বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বিকাশমান এবং আঞ্চলিক সংযোগে দেশের গুরুত্ব বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে আসিয়ান সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়, তাই সব সদস্যের সম্মতি পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক দিক থেকে আসিয়ানে যোগদান বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। আসিয়ান ব্লক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার, যেখানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, RCEP কাঠামো, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, কৃষি ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আসিয়ান বাজারে প্রবেশ করলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে এবং জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আসিয়ান সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে গঠিত। বাংলাদেশ ঐ অঞ্চলের বাইরে হওয়ায় এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও সদস্য দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত সংকট এবং রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশকে কূটনৈতিক চাপে ফেলছে, যা আসিয়ান সদস্যপদ প্রাপ্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তবুও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের মাঝামাঝি বাংলাদেশের অবস্থান চীন, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। আসিয়ান যদি বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের আসিয়ান সদস্যপদ অর্জনের প্রচেষ্টা এক দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ভিশন। মালয়েশিয়ার মতো কিছু রাষ্ট্রের সমর্থন ইতিবাচক দিক হলেও এখনো অনেক পথ বাকি। দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যদি বাংলাদেশ আসিয়ানের শর্ত পূরণ করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এই আঞ্চলিক জোটে যোগদানের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0