আলিবাবার আয়ের ঘাটতি, কিন্তু এআই-এর হাত ধরে ক্লাউড ব্যবসায় নতুন দিগন্ত
আলিবাবা সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিকে তাদের সামগ্রিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে, কোম্পানিটির ক্লাউড কম্পিউটিং ব্যবসা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর সহায়তায় অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।
চীন, ৩০ আগস্ট, ২০২৫—বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবা সম্প্রতি তাদের ত্রৈমাসিক আয়ের হিসাব প্রকাশ করেছে। যদিও সামগ্রিক রাজস্ব বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড কম্পিউটিং বিভাগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর ওপর ভর করে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আশার আলো জুগিয়েছে।
এই ত্রৈমাসিকে আলিবাবার ক্লাউড বিভাগের আয় ২৬% বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৪০ বিলিয়ন ইউয়ানে (প্রায় ৪.৬৭ বিলিয়ন ডলার)। এই প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষকদের ১৮.৪% প্রত্যাশাকে সহজেই ছাড়িয়ে গেছে। এই সাফল্যের পেছনে প্রধান কারিগর হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আলিবাবা চীনের এআই খাতে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পণ্য উন্মোচন করছে।
আলিবাবার গ্রুপ সিইও এডি উ (Eddie Wu) এক প্রেস কনফারেন্সে জানিয়েছেন যে, গত চার ত্রৈমাসিকে এআই অবকাঠামো এবং পণ্য গবেষণা ও উন্নয়নে তারা ১০০ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি বিনিয়োগ করেছেন। তার ভাষ্যমতে, "আমাদের এআই বিনিয়োগ এখন ফল দিতে শুরু করেছে। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে এআই আলিবাবার ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।"
আলিবাবার ই-কমার্স ব্যবসা, যা প্রতিষ্ঠানটির আয়ের প্রধান উৎস, এই ত্রৈমাসিকে প্রত্যাশিত বৃদ্ধি দেখাতে পারেনি। এতে সামগ্রিক রাজস্ব ২৫২.৯২ বিলিয়ন ইউয়ানের প্রত্যাশিত গড় থেকে ২% পিছিয়ে ২৪৭.৬৫ বিলিয়ন ইউয়ানে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রথমবারের মতো যখন আলিবাবা তাদের 'চায়না ই-কমার্স গ্রুপ'-এর আলাদা আয় প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে টাওবাও, টিমল, ইনস্ট্যান্ট কমার্স, এবং ফুড ডেলিভারি অ্যাপ ইলেমে। এই গ্রুপ ১০% প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে।
অন্যদিকে, তাৎক্ষণিক বাণিজ্যের (quick commerce) মতো নতুন উদ্যোগে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে আলিবাবার পরিচালন আয় ৩% এবং সমন্বিত ইবিআইটিএ (EBITA) ১৪% হ্রাস পেয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান পিডিডি হোল্ডিংস (PDD Holdings) এবং মেইতুয়ানও (Meituan) একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, কারণ বাজার ধরতে তারা ভর্তুকিভিত্তিক প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
সিএফআরএ (CFRA)-এর বিশ্লেষক অ্যাঞ্জেলো জিনো (Angelo Zino) মন্তব্য করেন, "যদিও দ্রুতগতির বাণিজ্য এবং এআই বিনিয়োগ ব্যবসার কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে, ব্যবহারকারী অধিগ্রহণ এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মুনাফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
তবে, আলিবাবার ই-কমার্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী জিয়াং ফ্যান (Jiang Fan) আশাবাদী। তিনি জানান, দ্রুতগতির বাণিজ্যকে কাজে লাগিয়ে তারা ই-কমার্স গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছেন এবং আগামী তিন বছরে এই খাত থেকে বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন ইউয়ান জিএমভি (GMV) আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
আলিবাবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগ ১৯% প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে তাদের সম্প্রসারণের ফল।
এছাড়াও, আলিবাবা তাদের লজিস্টিকস শাখা কাইনিয়াও-এর শেয়ার ফসুন ইন্টারন্যাশনাল (Fosun International) থেকে ৩৪৯.৮ মিলিয়ন ডলারে পুনরায় কিনে নিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, আলিবাবা তার মূল ব্যবসার পাশাপাশি কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করতে চাইছে।
সামগ্রিকভাবে, আলিবাবার এই ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন মিশ্র ফল দিয়েছে। একদিকে, তাদের ঐতিহ্যবাহী ই-কমার্স ব্যবসা চাপের মধ্যে থাকলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উচ্চ-প্রযুক্তি খাতে তাদের বিনিয়োগ ফলপ্রসূ হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ শুধু ভবিষ্যতের পথই প্রশস্ত করে না, বরং বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও সক্ষম। আলিবাবার এই যাত্রা যেন এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনই হবে সাফল্যের মূলমন্ত্র।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0