জুলাই ঘোষণাপত্রে কী আছে, সহজ ভাষায়

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের culmination হিসেবে ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান।

জুলাই ঘোষণাপত্রে কী আছে, সহজ ভাষায়
জুলাই ঘোষণাপত্র

যেহেতু বাংলাদেশের মানুষ উপনিবেশবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে এবং মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও সামাজিক সুবিচারভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল; কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রণীত সংবিধানের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অপব্যবহারের ফলে প্রথম সরকার সেই স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়। একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা, মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণসহ বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপের ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ক্ষুণ্ন হয় এবং পরবর্তীতে সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটে।

এরপর আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লম্বা ছাত্র-জনতার সংগ্রামে ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন ফিরলেও, পরে নানা দেশি-বিদেশি চক্রান্ত, ১/১১-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনার দীর্ঘ একচ্ছত্র শাসনামলে আবারও গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়ে। গত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী, দমনমূলক ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠে, যেখানে গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন, এবং বিচারবহির্ভূত ক্ষমতার অপপ্রয়োগ চলে। কোটা সংস্কার ও ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলনের সময়ও রাষ্ট্র দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়।

ফলস্বরূপ, ছাত্র ও জনগণের অসহযোগ আন্দোলন, বিশেষত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণভবনমুখী অভ্যুত্থান, জনগণের ঐক্য এবং সামরিক বাহিনীর নৈতিক সমর্থনের মুখে শেখ হাসিনা সরকার পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়। জনগণের অভ্যুত্থান ছিল রাজনৈতিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিসঙ্গত ও বৈধ। এর পর অবৈধ সংসদ ভেঙে দিয়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই গণ-অভ্যুত্থান ফ্যাসিবাদবিরোধী আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক ন্যায় এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের জনগণের সম্মিলিত প্রত্যয়কে প্রকাশ করে।

সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ এখন একটি সুশাসনপূর্ণ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার চায়, যেখানে আইনের শাসন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করা হবে। জনগণ প্রত্যাশা করে, বিগত ১৬ বছরের নির্যাতন, গুম, গণহত্যা ও লুণ্ঠনের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে। আন্দোলনে নিহত শহীদদের ‘জাতীয় বীর’ ঘোষণা এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে। জনগণ চায় নতুন নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে একটি সংস্কারকৃত সংবিধান প্রণয়ন করা হোক, যাতে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। এই সমাজ হবে দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত, মূল্যবোধসম্পন্ন এবং জলবায়ু ও পরিবেশবান্ধব।

এছাড়াও জনগণ প্রত্যাশা করে, ২০২৪ সালের ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে এবং এই ঘোষণাপত্র পরবর্তী সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তাই ৫ আগস্ট ২০২৪-এ বিজয়ী জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এই “জুলাই ঘোষণাপত্র” প্রণয়ন করা হলো।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0