পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবির সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ, উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন
বাংলাদেশ–পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করেন, পাকিস্তানি মন্ত্রী ইসহাক দারের দাবির সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়। গণহত্যার স্বীকৃতি ও ক্ষমা প্রার্থনা, আর্থিক হিসাব-নিকাশ এবং আটকে থাকা নাগরিকদের ফেরত নেওয়া—এসব বিষয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছে। উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে, এসব ইস্যুর সমাধান ছাড়া সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না।
ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অতীত ইতিহাসের বোঝা বহন করে চলেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা, আটকে থাকা পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেরত পাঠানো এবং আর্থিক হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তি—এই তিনটি বিষয় আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বহুবার আলোচনার টেবিলে এলেও এগুলো কখনোই সঠিক সমাধানে পৌঁছায়নি। দীর্ঘ বিরতির পর অবশেষে এ বিষয়গুলো আবারও আলোচনায় এসেছে।
রোববার সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে দুপুরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তৌহিদ হোসেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, পাকিস্তানের দাবির সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়।
ইসহাক দার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, ১৯৭১ সালের সঙ্গে সম্পর্কিত অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি আগেই হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর ভাষায়, “যদি সমাধান হয়ে যেত, তবে আজ আবার এই বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন হতো না।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, বৈঠকে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে এবং সম্মত হয়েছে যে ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে আলোচনা চলবে।
তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের আরও জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈঠকে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, তার জন্য পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ এবং ক্ষমা চাইতে হবে। পাশাপাশি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ভেতরে আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেরত নেওয়া পাকিস্তানের নৈতিক দায়িত্ব। আর্থিক দাবি-দাওয়ার বিষয়েও সমাধান না হলে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না বলে বাংলাদেশ পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে।
তিনি বলেন, “আপনারা নিশ্চয়ই আশা করেন না যে ৫৪ বছরের পুরোনো সমস্যার সমাধান এক দিনের বৈঠকেই হয়ে যাবে। আজকের এই আলোচনা দীর্ঘ বিরতির পর হয়েছে, এবং এটিও কোনো পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরের অংশ নয়, বরং একটি আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবু আমরা একে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছি, কারণ আলোচনার নতুন দিগন্ত খুলেছে।”
বৈঠক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, পাকিস্তানের বক্তব্য আর বাংলাদেশের বক্তব্যের মধ্যে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, সেটি কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। উত্তরে তৌহিদ হোসেন বলেন, “আমরা তিনটি বিষয়ের ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছি। অন্যদিকে তারা বলেছে, এসব বিষয়ে আগেই সমাধান হয়ে গেছে। এই দুই ভিন্ন অবস্থানই আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। তবে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে এ বিষয়গুলো সমাধান ছাড়া সম্পর্ক এগোবে না।”
আরেক প্রশ্নে জানা যায়, এই আলোচনায় তৃতীয় কোনো দেশ, বিশেষ করে চীনের ভূমিকা আছে কি না। তৌহিদ হোসেন তা নাকচ করে দেন। তিনি জানান, চীন বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নয়নে উৎসাহিত করেছে ঠিকই, তবে আলোচনার উদ্যোগ মূলত দ্বিপক্ষীয়। বরং আগের সরকারের সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ইচ্ছাকৃতভাবে পিছিয়ে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার চায়, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কও যেন অন্যান্য দেশের মতো স্বাভাবিক ও টেকসই হয়।
কূটনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যখন আবার আলোচনার টেবিলে বসছে, তখন সেটি সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি করছে। যদিও অতীতের জটিল ও সংবেদনশীল ইস্যুগুলো সহজে নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবুও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারই ইতিবাচক দিক।
বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, অতীতের ঘটনাগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করে নতুন অধ্যায় শুরু করা সম্ভব নয়। অপরদিকে পাকিস্তান এখনো সেই ইতিহাসের দায় স্বীকারে অনীহা প্রকাশ করছে। তবে উভয় পক্ষের পুনরায় আলোচনায় বসা ইঙ্গিত দেয় যে, সম্পর্কের জট কাটাতে অন্তত ন্যূনতম রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো যত দিন সমাধান না হবে, তত দিন বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক পূর্ণ স্বাভাবিকতা পাবে না। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথে এগোনোর প্রত্যাশা কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে জেগে উঠেছে।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0